বাংলাদেশের শীর্ষ রফতানি গন্তব্যের ৯টি দেশই ইউরোপীয় ইউনিয়নের

মোহাম্মদ হাসান আরিফ

ভাইস চেয়ারম্যান ও প্রধান নির্বাহী (অতিরিক্ত সচিব), রপ্তানি উন্নয়ন ব্যুরো (ইপিবি)

বাংলাদেশের শীর্ষ ২০ রফতানি গন্তব্যের ক্ষেত্রে এক নম্বরে আমেরিকা। বাকি ১৯ দেশের মধ্যে নয়টিই হচ্ছে ইউরোপীয় ইউনিয়নের।

এ নয়টি দেশ এবং ইউরোপীয় ইউনিয়নের বাকি দেশগুলো যদি আমরা ধরি, আমাদের রফতানির ৪৩ শতাংশ আসছে শুধু ইউরোপীয় ইউনিয়নের (ইইউ) গন্তব্য থেকে। যদিও দ্বিপক্ষীয় বাণিজ্যে আমেরিকা একক দেশ হিসেবে এক নম্বরে, তথাপি সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ রফতানি গন্তব্য হচ্ছে ইউরোপীয় ইউনিয়ন মার্কেট। আমাদের রফতানির ক্ষেত্রে এ বাজারের গুরুত্ব অপরিসীম।

গত বছর ইউরোপের মার্কেটে আমরা একটা মিশ্র চিত্র দেখেছি। কিছু দেশে আমাদের ইতিবাচক প্রবৃদ্ধি ছিল, আবার কিছু দেশে নেতিবাচক ধারা ছিল। সামগ্রিকভাবে কোনো একটা নির্দিষ্ট কারণে আমরা ঠিক বলতে পারি না যে ভালো করেছি বা খারাপ করেছি। যেমন আমরা স্পেনে ভালো করেছি, কিন্তু জার্মানিতে খারাপ করেছি। এ রকম একটা মিশ্র প্রবণতা ছিল।

আমেরিকার পক্ষ থেকে আমাদের ওপর শুল্ক আরোপ হয়েছে। আপনারা জানেন, এগ্রিমেন্ট অন রেসিপ্রোকাল ট্রেড (এআরটি) সম্পন্ন হয়েছে। আমরা ভেবেছিলাম যে আমেরিকায় আমাদের রফতানি হয়তো কমে যাবে, কিন্তু আমেরিকা আমরা মোটামুটি ধরে রেখেছি। তবে যেটা হয়েছে, আমাদের যে প্রতিযোগীরা, তাদের যেহেতু আমেরিকায় আমাদের চেয়ে বেশি শুল্ক আরোপ হয়েছে, তারা তাদের পণ্য ইইউর বাজারে সরিয়ে দিয়েছে। এ কারণে আমাদের রফতানিকারকরা ইউরোপীয় বাজারে দামে খুব বড় প্রতিযোগিতার মুখোমুখি হয়েছেন।

আরো বিষয় হচ্ছে যে পশ্চিমা দেশগুলোতে আমাদের রফতানি মধ্যপ্রাচ্য দিয়ে যায়, সেখানে মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধ পরিস্থিতির কারণে তা কিছুটা বাধাগ্রস্ত হয়েছে। এর পরও আমি বলব যে গত বছর সামগ্রিকভাবে বাংলাদেশ রফতানি ধরে রেখেছে। জ্বালানি নিয়ে আমাদের সমস্যা হচ্ছে, যুদ্ধের কারণে বা পণ্য পরিবহনে বিঘ্ন ঘটছে, তার পরও আমাদের রফতানি আমরা ধরে রেখেছি। প্রাথমিক হিসাবে যদিও আমরা সামান্য নেতিবাচক দেখেছিলাম, পরবর্তী সময়ে বাংলাদেশ ব্যাংক থেকে পাওয়া সমন্বিত হিসাবে দেখা গেছে যে সামান্য কিছু হলেও আমরা বেশি রফতানি করেছি।

গত বছর আমাদের দেশে একটা বড় রাজনৈতিক পরিবর্তন হয়েছে, নতুন সরকার এসেছে। আমরা আশা করি যে এ বছরটা হয়তো আমাদের অত্যন্ত ভালো একটা পরিস্থিতি দাঁড়াবে। কারণ ক্রেতারা দেখবে যে দেশে একটা স্থিতিশীল পরিস্থিতি বিরাজ করছে, যা তাদের ইতিবাচক রাখবে।

আরেকটা বড় জিনিস, ইইউর সঙ্গে আমাদের মুক্ত বাণিজ্য চুক্তির (এফটিএ) যে উদ্যোগটা, সেটা মোটামুটি একটা পর্যায়ে চলে এসেছে। তারাও সম্মত হয়েছেন এবং আমাদের দুই পক্ষের মধ্যে আলোচনাকারীও (নেগোশিয়েটর) নির্ধারণ করা হয়ে গেছে। আমরা আশা করছি যে এ বছরই আমাদের এ আলোচনা শুরু হয়ে যাবে। এটাও আমাদের ক্রেতাদের কাছে একটা ইতিবাচক বার্তা দেবে। ইইউর সঙ্গে চুক্তির ক্ষেত্রে হয়তো কিছুটা সময় লাগবে, রাতারাতি তো হবে না। তবে আমরা আশা করছি যে আরেক দিকে আমাদের উত্তরণ হয়তো একটু পিছিয়ে যাবে।

পাশাপাশি যদি আমরা বাণিজ্য চুক্তি সম্পাদন চালিয়ে যেতে পারি, যেমন এরই মধ্যে জাপানের মতো উন্নত দেশের সঙ্গে বা দক্ষিণ কোরিয়ার মতো দেশের সঙ্গে আমরা সফলভাবে বাণিজ্য চুক্তি সম্পন্ন করেছি, সেটা আমাদের যেমন অভিজ্ঞতা একদিকে বাড়িয়েছে, তেমনি গ্রহণযোগ্যতা বা ভাবমূর্তি অন্যান্য দেশের সঙ্গে আলোচনার ক্ষেত্রে বৃদ্ধি করেছে। তারাও আমাদের ওপর বেশি আস্থা পাবে। আমরা আশা করব দ্রুতই আমরা এটা শেষ করতে পারব। উত্তরণ হয়ে গেলে আমাদের হয়তো রফতানিতে একটা চাপ পড়বে বলে যে আশঙ্কা বা বিভিন্ন হিসাব আছে, এফটিএর ইতিবাচক প্রভাবের কারণে সেই চাপটা হয়তো আমরা মোকাবেলা করতে পারব।

আমরা রপ্তানি উন্নয়ন ব্যুরোর পক্ষ থেকেও ইউরোপীয় ইউনিয়নে এবং এর বাইরে যুক্তরাজ্য, যদিও তারা এখন ইউরোপীয় ইউনিয়নে নেই, তবুও তারা একটা বড় গন্তব্য, সবগুলোর সঙ্গেই কাজ করছি, যাতে রফতানি আরো বাড়ানো যায়, রফতানির সুযোগ যেটা আমাদের আছে সেটাকে কাজে লাগানো যায়।

এ মাসের শেষে আমাদের ইইউর একটি বড় গুরুত্বপূর্ণ দেশ ফ্রান্সে একটা ব্যবসায়ী প্রতিনিধি দল যাচ্ছে। আমরা সেখানে বছরে দুটো আন্তর্জাতিক মেলায় অংশ নিই। ৩১ আগস্ট থেকে প্যারিসে মেলাটি শুরু হবে, যেখানে বাণিজ্য প্রতিনিধি দলে বিজিএমইএ ও বিকেএমইএর সভাপতিরা যোগ দিচ্ছেন। আমরা আশা করছি, সরকারি ও বেসরকারি খাত মিলে আমরা ইউরোপের ক্রেতাদের কাছে আমাদের নতুন ইতিবাচক বার্তা তুলে ধরতে পারব। দেশের পরিবর্তিত পরিস্থিতিতে এবং ইইউর সঙ্গে আমাদের আলোচনা শুরু হওয়ার এ ইতিবাচক আস্থার জায়গাটা আমরা ক্রেতাদের কাছে তুলে ধরার চেষ্টা করব।

সামনে আরো বেশকিছু মেলায় ইউরোপীয় ইউনিয়নে আমাদের রফতানিকারকদের নিয়ে যাব এবং আশা করি, আমাদের অব্যাহত প্রচেষ্টা যদি থাকে সারা বছরজুড়ে, তাহলে ইইউর বাজারেও আমরা ভালোই করব এবং এর প্রতিফলন আগামী বছরের রফতানি আয়ে দেখা যাবে।

ইউরোপের বাজারে শুল্ক ও অশুল্ক বাধা নিয়ে দুই পক্ষের মধ্যে আলোচনা চলছে এবং কাজগুলো প্রক্রিয়াধীন আছে। গত বছর নভেম্বরে ইইউর কর অফিস থেকে তাদের শর্তগুলো যথাযথভাবে পালন করা হচ্ছে কিনা তা দেখার জন্য একটি পরিদর্শন হয়েছিল। তারা ঢাকা, চট্টগ্রাম, গাজীপুরের বিভিন্ন কারখানা সরজমিনে পরিদর্শন করেছেন। তারা আমাদের পোশাক খাত নিয়ে সন্তুষ্ট ছিলেন যে উৎসবিধির বিষয়গুলো যথাযথভাবে প্রতিপালন করা হচ্ছে। তবে তাদের খাদ্য প্রক্রিয়াজাত শিল্প নিয়ে একটু আপত্তি ছিল।

সব মিলিয়ে আমাদের কয়েকটা বিষয়ে সমন্বয় করতে এবং চারটা কাজ করতে বলা হয়েছিল। তারা একটা সময় বেঁধে দিয়েছিলেন, যার মধ্যে জুন মাসের কাজগুলো আমরা এরই মধ্যে করে ফেলেছি এবং বাকিগুলোর সময়সীমা আছে ডিসেম্বর পর্যন্ত। আমরা কাজ করে যাচ্ছি এবং আশা করছি ডিসেম্বরের আগেই তা শেষ করতে পারব।

আরেকটা বিষয় না বললেই নয়। অনেক সময় ইইউর বিভিন্ন ক্রেতারা এবং তাদের প্রতিনিধিরা আমাদের সরবরাহকারী বা রফতানিকারকদের ওপর বিভিন্ন রকম চাহিদা বা নিরীক্ষা চাপিয়ে দেন। দুর্ভাগ্যজনকভাবে একই পণ্য যখন তারা অন্য সরবরাহকারীর কাছ থেকে, যেমন চীনের কাছ থেকে সংগ্রহ করে, তখন কিন্তু এ বিষয়টি সেখানে আরোপ করে না বা করার সাহস পায় না। তারা চীনের কাছ থেকে এটা চায় না। এটা এক ধরনের বৈষম্য।

আমাদের বাংলাদেশের সরবরাহকারীর কাছে আপনি পরিবেশ, শ্রম ও অন্যান্য মানদণ্ড মেনে চলার নামে এটা চাইবেন আর অন্যের কাছে চাইবেন না, এটা তো হতে পারে না।

আমরা এ বিষয়টি বিভিন্ন ফোরামে তুলছি, যেখানে ইউরোপীয় ইউনিয়ন, এশীয় উন্নয়ন ব্যাংকসহ অন্যান্য উন্নয়ন অংশীদাররা আছেন। আমরা ক্রেতাদের সামনে এবং আমাদের রফতানিকারকদের বলছি যে যদি ইইউর বাধ্যতামূলক বিধান হয়, সেটা আমাদের অবশ্যই মানতে হবে; কিন্তু এ চাওয়াটা যেন সবার ক্ষেত্রে সমান হয়।

সামনের দিনগুলোতে সরকারের পক্ষ থেকে এবং আমাদের রফতানিকারকদের পক্ষ থেকে আমরা আমাদের অবস্থান শক্ত করব। আমরা নিয়মনীতি মেনে চলব, তবে আমাদের সঙ্গে যেন কোনো রকম বৈষম্যমূলক আচরণ না করা হয় এবং সবার জন্য সমান প্রতিযোগিতার ক্ষেত্রটা যেন ঠিক রাখা হয়। আমাদের সঙ্গে যেন সমানভাবে আচরণ করা হয় সেটি নিশ্চিত করতে হবে।

আরও